সোমবার, ৩০ জানুয়ারী ২০২৩, ০৪:১৫ অপরাহ্ন

(অাবু সুফিয়ান রাসেল, কুমিল্লা )
কুমিল্লা জেলা স্বাস্থ্য বিভাগের বার্ষিক প্রকাশনা “সুস্বাস্থ্য ২০১৭ কুমিল্লা”  মধ্যে কুমিল্লায় সরকার অনুমদিত  সকল সরকারি, বেসরকারি হাসপাতাল, কলেজ, ক্লিনিকের তালিকা প্রকাশ করেছে। এ প্রকাশনায় নেই সনাতনপ্রথার চিকিৎসা হোমিও কলেজের নাম।

কুমিল্লায় দু’টি হোমিও কলেজ রয়েছে। নাঙ্গলকোট বাদশা অামেনা হোমিও কলেজ, হ্যানিম্যান হোমিওপ্যাথি মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল,  পুরাতন চৌধুরীপাড়া, কুমিল্লা। সম্প্রতি একই রোগী একই রোগ নিয়ে তিনজন হোমিও ডাক্তারের পরামর্শ নিতে গেলে, তিন জনের পরামর্শ তিন রকম হয়। ফলে অালোচনায় চলে অাসে হোমিও চিকিৎসা। ।

একজন সুস্থ ব্যাক্তির শরীরে যে ওষুধ প্রয়োগ করলে তার মধ্যে যে লক্ষণ দেখা দেয়, সে ঔষুধ অসুস্থ ব্যক্তির উপরে প্রয়োগ করলে তা অসুস্থ ব্যক্তির জন্য রোগ নিরাময়ের কাজ করে। হ্যানিম্যানের  এই তত্ত্বের উপর ভিত্তি করেই গড়ে উঠেছে হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসা ব্যবস্থা। হ্যানিম্যানের বিশ্বাস সকল অসুখের মূলে রয়েছে “মিয়াসম” নামক একধরনের প্রতিক্রিয়া এবং হোমিওপ্যাথিক ওষুধ এই মিয়াসম দূর করার জন্য কার্যকর।

হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসার মূলনীতিকে অনেক আগেই বৈজ্ঞানিকভাবে ভুল প্রমানিত করা হয়েছে এবং এর কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তিও খুঁজে পাওয়া যায়নি।যদিও কিছু কিছু গবেষণায় এর কার্যকারিতার পক্ষে কিছু তথ্য পাওয়া গেছে। আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানে এবং বৈজ্ঞানিক মহলে হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসা পদ্ধতিকে অবৈজ্ঞানিক, আজগুবি আর হাতুড়ে চিকিৎসা হিসেবে গন্য করা হয়। রোগী চিকিৎসায় এর প্রয়োগের নীতিহীনতা বিজ্ঞানীরা সমালোচনা করে থাকেন এবং অনেকেই একে প্রতারণার সামিল মনে করেন।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ২০০৯ সালে একটি বিবৃতিতে জানায় যে, হোমিওপ্যাথি কোনো বিজ্ঞানসম্মত চিকিৎসা নয়।

ভারত ও বাংলাদেশে এক শতাব্দীপূর্ব থেকে এই চিকিৎসা চলছে। বাংলা ভাষায় বহু বই রয়েছে এ বিষয়ে যার উপর ভিত্তি করে চলে এ চিকিৎসা। বাংলাদেশে প্রচলিত হোমিও শিক্ষা ও চিকিৎসা নিয়ে রয়েছে নানা সমালোচনা ও অব্যবস্থাপনা।

হোমিওপ্যাথি চিকিৎসার উপরেই নির্ভর করেন এমন মানুষের সংখ্যাও নেহাত কম নয়। হোমিওপ্যাথি ভক্তদের বক্তব্য এটা খুব ধীরে কাজ করে ও সঠিক কাজটা পরিপূর্ণভাবে করে। ম্যাটস, মেডিকেল, প্যারামেডিক্যাল সহ চিকিৎসা বিজ্ঞানের যে কোন শাখায় পড়ার জন্য বিজ্ঞান বিভাগ বাধ্যতামূলক হলেও হোমিও চিকিৎসার জন্য এমন কোন ধরা বাঁধা অাইন নেই। নেই বয়সের কোন হিসাব নিকাশ,  দেখা যায় একই ব্যাচে দাদা-নাতি ভর্তি হতে। রয়েছে পাঠ্যক্রম ও পাঠপুস্তক নিয়ে নানা প্রশ্ন।

কিন্তু বছরের পর বছর বের হচ্ছে কয়েক হাজার ডাক্তার। শহরের অলিগলি থেকে শুরু করে, গ্রামে গঞ্জে রয়েছে অগণিক হোমিও  ডাক্তার।  অভিযোগ রয়েছে বছরের শুরুতে ভর্তি আর বছরের শেষে গিয়ে পরীক্ষা দিলেই হয়ে যায় হোমিও ডাক্তার। টাকা দিলেই পরীক্ষা দেওয়া যায়। ক্লাস করতে হয় না।

কুমিল্লায় হোমিও কলেজ ও শিক্ষার্থী  সংখ্যা বিষয়ে জানতে চাইলে, জেলা শিক্ষা অফিসার মো. অাব্দুল মজিদ বলেন, হোমিও প্রতিষ্ঠানগুলো বার্ষিক শিক্ষা জরিপে অংশ গ্রহণ করে না। হোমিও শিক্ষা বিষয়ে কোন তথ্য অামাদের দফতরে নেই। একাদিক প্রতিষ্ঠানে একই সাথে ভর্তি বিষয়ে তিনি জানান, এটা বেঅাইনি।

হোমিও অধ্যাপক ফারভীন সুলতানা মনে করেন, সরকার যদি এ্যালেপাথির মত, হোমিও চিকিৎসার প্রতি গুরুত্বরোপ করেন, তাহলে এ বিভাগ থেকেও উন্নত চিকিৎসা দেওয়া সম্ভব। প্রতি জেলায় একটি করে সরকারি হোমিও কলেজ স্থাপন করলে মানুষ সহজে চিকিৎসা পাবে।

হোমিও ৩য় বর্ষের ছাত্র হাফেজ রুহুল অামিন বলেন, এখন পর্যন্ত এ্যালেপাথির পার্শপতিক্রিয়া কারণে বহু ঔষধ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। তবে হোমিওর কোন ঔষধ নিষিদ্ধ হয়নি। কারণ হোমিও ঔষধে কোন পার্শপতিক্রিয়া নেই।

দেশের সকল শিক্ষাব্যবস্থা ফল প্রকাশে গ্রেডিং/ ডিভিশন পদ্ধতিতে হয়ে থাকলেও হোমিও ডাক্তারদের ফল প্রকাশ হয় পাশ বা ফেল। স্বাস্থ্য বিভাগ থেকে রোগীকে ব্যবস্থাপত্র লিখে দেওয়া ব্যধ্যতামূলক হলে ও বেশির ভাগ হোমিও ডাক্তার ব্যবস্থাপত্র না দিয়ে সরাসরি ঔষধ দিয়ে দেন।

ফলে রোগী ঐ ডাক্তারের নিকট জিম্মি হয়ে যায়। অন্য ডাক্তারের নিকট চাইলেও যেতে পারে না। অাবার ডাক্তার যদি ভুল ঔষধ দিয়ে থাকেন, তার ও কোন প্রামাণ থাকে না। অভিযোগ রয়েছে ক্লাস না করে, ইন্টির্ণ শেষ না করে, বসে যান বানিজ্যিক
হোমিও দোকান নিয়ে।

কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ মেডিসিন বিভাগের প্রধান প্রফেসর ডাক্তার মাহবুবুল ইসলাম মজুমদার জানান, হোমিওর জন্ম জার্মানিতে তবে তারা এ চিকিৎসা পদ্ধতি গ্রহণ করেনি। এবং এমবিবিএস কোর্সে হোমিও মেডিসিন নিয়ে কোন অধ্যায় নেই। তিনি মনে করেন হোমিওর কিছু ঔষধের কার্যকারিতা অাছে। কিছু ঔষধ কোন কাজে অাসে না।

সারা দেশে ৬৩টি অনুমধিত হোমিও কলেজ রয়েছে।  হোমিও বোর্ড ও চিকিৎসার সার্বিক বিষয়ে জানতে ধারাবাহিকভাবে চেষ্টা করেও বাংলাদেশ হোমিও বোর্ড কর্মকর্তাদের  সাথে মোবাইলে যোগাযোগ করা স্থাপন করা যায়নি। বোর্ড টিনটি নম্বরে কল দিলে কেউ রিসিভ করেনি। বোর্ড ওয়েবসাইটে প্রদত্ত নম্বর প্রশাসনিক কর্মকর্তার নম্বর কল দিলে তা বন্ধ পাওয়া যায়। পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক ফোন রিসিভ করেননি। সেকশন অফিসার মোবাইল রিভিব করলেও এ বিষয় তার দায়িত্ব না বলে মন্তব্য করেন। এবং সরাসরি বোর্ডে গিয়ে চেয়ারম্যানের সাথে কথা বলার জন্য বলেন।

এ বিষয়ে জেলা সিভিল সার্জন ডা. মো. মুজিবুর রহমান জানান, হোমিও প্রতিষ্ঠানগুলো অামাদের দায়িত্বে নেই। হোমিও স্বতন্ত্র বোর্ড রয়েছে। তারা দেখাশোনা করে। হোমিও চিকিৎসকরা নামের শুরুতে ডাক্তার শব্দ ব্যবহার করার বিষয়ে তিনি বলেন, এমবিবিএস কোর্স ব্যতিত অন্য কোন কোর্স করে নামের শুরুতে ডাক্তার ব্যবহার করা যাবে না। যদি হোমিও চিকিৎসকরা ডাক্তার ব্যবহার করে, তাহলে ব্রাকেটে ডিএইসএমএস বা হোমিও শব্দ রাখতে হবে। যেন সাধারণ মানুষ বিভ্রান্ত না হয়।

আরও পড়ুন

%d bloggers like this: