মঙ্গলবার, ৩১ জানুয়ারী ২০২৩, ১১:৫৪ পূর্বাহ্ন

অনলাইন ডেস্ক:
বাংলাগানের যুবরাজ আসিফ আকবর ৫৭ ধারার একটি মামলায় গ্রেপ্তার হয়ে কয়েকদিনের জন্য ছিলেন ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে বন্দি। গত সোমবার তিনি জামিনে মুক্তি পান।জীবনের প্রথম জেল জীবন কেমন ছিল তার ওপর আসিফ আকবর আজ বুধবার একটি লেখা প্রকাশ করেছেন নিজের ফেসবুক পেজে। আসিফ আকবরের লেখাটি হুবহু প্রকাশ করা হলো ।

আমি কয়েদী নাম্বার ২৫০২৭। কারাগারের উঁচু প্রাচীরগুলো ভয় জাগানিয়া। আনুষ্ঠানিকতা শেষে ঢুকলাম কারা হাসপাতালের কেবিনে । একজন মুরুব্বীর নেতৃত্বে মাগরিবের নামাজের জামাত চলছে । বাইরে ঝোলানো ভয়ানক তালা, ঢুকতে হলো চার দেয়াল আর লোহার গরাদ বেষ্টিত কক্ষটিতে। মনে হচ্ছিলো- বাবা মা হারিয়ে ফেলা অনাথ আশ্রমে আশ্রয় পাওয়া এক এতিম আমি। নামাজ শেষ হওয়ার আগ পর্যন্ত দাঁড়িয়ে চারিদিকের মাপ নিচ্ছিলাম। নামাজ শেষে মাথা নীচু করে হেঁটে গেলাম আমার জন্য রাখা নির্ধারিত বিছানায়। শত সহস্র অনুসন্ধিৎসু চোখের আড়ালে নিজেকে লুকানো অসম্ভব। চোখ ভিজে আসতে চাইছে। দৃঢ়তা আর সততার ট্যাবলেট খাওয়া সিদ্ধান্ত – নাহ… পানি বের হতে দেয়া যাবেনা, শুধু রক্তই বেরুতে পারে।

ব্যাগটা রেখে গোসলে গেলাম। প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র তাড়াহুড়োয় আনা হয়নি, এগিয়ে এলো আরেক কয়েদী প্লাস রাইটার- শাওন। তার অধীনেই চলে এই অবরুদ্ধ কক্ষটি। সবাই তাকাচ্ছে আমার দিকে, আমি কুঁকড়ে আছি নতুন পরিচয় হজমের আতঙ্কে। কবে আসবে রুপকথার ফিনিক্স পাখীটা !! আর কতদিন গল্প শুনে যেতে হবে!! আমিই তো ফিনিক্স, আজন্ম এক যোদ্ধা, আমার অদম্য অগ্রযাত্রা থামবে শুধু মৃত্যুতেই …

মুহূর্তেই ঝেড়ে ফেললাম অতীত, মুখে নিয়ে আসলাম বিজয়ীর হাসি। সবার সাথে হাত আর বুক মেলানো শুরু করলাম। কিছু কয়েদী এগিয়ে এলেন, আর কিছু আছেন অব্জারভেশনে। এর মধ্যে খুনে চোখ, অসহায় চোখ, ভালবাসার চোখ, সন্দেহের চোখ, করুণার চোখ, নেশার চোখ, বন্ধুত্বের চোখ – সবই আছে। নানান চোখের নানান ভাষা, ওগুলো পরেও পড়া যাবে। সারাদিন কিছু খাইনি, আগে একটু খেয়ে নেই, অনেক ক্ষুধা পেয়েছে…

দু’টুকরো মুরগীর মাংস আর ভাত দেয়া হলো খাবারে । ভুনা মাংসে ঝোল নেই,আমি আবার শুকনো খাবার খেতে পারিনা । শাওন’কে ডালের কথা বলবো কীভাবে সেই সিদ্ধান্ত নিতে পারছিলাম না । পরে কাঁচা লবন চেয়ে নিয়ে খাওয়া শুরু করলাম। প্রতি লোকমা ভাত চিবিয়ে যাচ্ছি অনন্তকাল, গিলতেই পারছিনা। হঠাৎ করে মনে হল পানি তো আছে। লজ্জায় ঠান্ডা পানিও চাইতে পারছিলাম না। পরে পানি দিয়ে গপাগপ খেয়ে ফেললাম। মাংসের প্রতিটি অংশই অনেক Expensive মনে হচ্ছিলো । খাওয়া শেষে সাবান পাইনা হাত ধোবার, সর্বকনিষ্ঠ বন্দী মাহবুব নিয়ে এলো হ্যান্ড-ওয়াস ।

এদিকে পাঞ্জাবী আর প্যান্ট ও ধোয়া দরকার, ভাবলাম পানিতে ভিজিয়ে রাখি পরে ধুয়ে নিবো। ছোট মাহবুব তা হতে দিলোনা, সে কাপড়গুলো ধুয়ে ফেললো। এবার আর শরীর চলে না। খাওয়ার পর অনন্ত বিশ মিনিট হাঁটি, সেটা আর সম্ভব হলনা ,পড়ে গেলাম বিছানায়, শরীর জুড়ে ক্লান্তি আর ক্লান্তি ।

বালিশটা প্রথমে বানানো হয়েছিল শিমুল তুলো দিয়েই। মাথা রেখে মনে হলো গ্রানাইট পাথরের সঙ্গে বাড়ি খেয়েছি, পিঠের নীচে বেড শীটটা স্যাঁতস্যাঁতে লাগছিলো। এতো কিছু কে দেখে, চোখ জুড়ে ঘুমের সীমাহীন আক্রমন। কোলবালিশ আর কাঁথা আমার নিত্যসঙ্গী, ভাবার সময় নেই । মশাদের সান্নিধ্যে ভ্যাপসা গরমে ঘুমালাম প্রায় দু’ঘন্টা। আমার রুটিন এখানে চলবে না, তাই ঘুম থেকে উঠে দাঁত ব্রাশ করে রাতের খাবার খেয়ে নিলাম ঝটপট, নইলে আবার অভূক্ত থাকতে হবে, তেলাপিয়া মাছের দো পেয়াজা খুব টেষ্টি ছিলো। অমৃতের স্বাদ পেয়েছি, জীবনে এতো ভাল খাইনি।

খাওয়া শেষে রুমের প্যাসেজে হাঁটা শুরু, একজন ডাকলেন, ও গায়ক সাব এইহানে একটু বইয়া একটা বিড়ি খান, আমনে তো মেশিনের লাহান খানা আর আডা শুরু করসেন। বরিশালের মূলাদীর মানুষ তিনি । পাশে গিয়ে বসলাম, আস্তে আস্তে সবাই আসা শুরু করলেন, আমিও ফর্মে ফেরার সিগন্যাল পেলাম ।

রাত জাগা আমার অভ্যাস। জেলে বাতি বন্ধ হয়না, একটু কমানো হয়। দুটো শ্যূটিং মিস হল এই কারাবাসে, অনুতপ্ত বোধ করছি। নানান ভাবনা মনে, নানান ফ্ল্যাশ ব্যাক চোখে। একা একা শুয়ে হাসি আর রণ রুদ্র’র কথা ভাবি। ওরা মাত্র ক্লাস সিক্সে হোষ্টেলে ঠিক এমনই পরিস্থিতিতে ছিলো, ওরাও নিশ্চয়ই বাসায় শুয়ে আমার জন্যও ভাবছে, আজ দু’রাত ছেলেদের চুমু দেইনা। ওরা জানে ওদের বাবা একা একা ভয় পায়, একা থাকতে পারে না। ফজরের শেষে ঘুম জড়িয়ে এলো চোখে, ঠিক সকাল সাড়ে সাতটায় ডাক, হাজিরায় যেতে হবে স্বাক্ষর করার জন্য। মেজাজ খিচড়ে গেলো, সামলে নিলাম পরক্ষনেই, এখানে আমি আগন্তুক ,নিয়ম মেনে চলাটাই বুদ্ধিমানের কাজ …

ভিডিওটি দেখতে   এখানে ক্লিক করুন:

আরও পড়ুন

%d bloggers like this: