মঙ্গলবার, ৩১ জানুয়ারী ২০২৩, ০৭:১৮ পূর্বাহ্ন

অনলাইন ডেস্ক:
অদৃশ্য সাপ আতঙ্ককে পুঁজি করে চুয়াডাঙ্গায় আলমডাঙ্গার পল্লী বলেশ্বরপুর গ্রামে গত কয়েকদিন ধরে চলছে বাপ-ব্যাটার হাত চালানসহ ঝাড়ফুঁকের রমরমা নাটক। এর আড়ালে রয়েছে অর্থ-বাণিজ্যের ফাঁদপাতার পায়তারা। গত বুধবার থেকে এ ঝাড়ফুঁক নাটকের সাথে যুক্ত হয়েছে একই উপজেলার বেলগাছি শেখ পাড়ার সুফিয়া খাতুন নামের এক নারী কবিরাজ। তিনি ও ধ্যানের নামে জিনসাপের কথা বলে আতঙ্কের মাত্রা বাড়িয়ে দিয়েছে কয়েকগুণ। ফলে বলেম্বরপুর উত্তরপাড়া বা স্কুল পাড়ার আবাল বৃদ্ধ বনিতা এখন জিনসাপের খুশি করতে ছিন্নি-সালাতের আয়োজন নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে।

জানা গেছে, আলমডাঙ্গা শহর থেকে ২০ কিলোমিটার দূরের গ্রাম বলেশ্বরপুর। আলমডাঙ্গা আইলহাস ইউনিয়ের বলেশ্বরপুর স্কুলপাড়ায় গত বুধবার কে বা কারা সাপ আতঙ্ক ছড়ায়। অদৃশ্য সাপে কাটছে বলে আতঙ্ক ছড়ালে মহল্লায় বেশ ক’জন তাতে আতঙ্কগ্রস্থ হয়ে আক্রান্ত হয়ে পড়ে। কেউ মাঠে গিয়ে কাঠির খোঁচায় কাটলেও সাপে কেটেছে বলে আতঙ্কগ্রস্থ হয়ে বাড়ি ফিরে ওই বাপ-ব্যাটা ওঝার কাছে গিয়ে চিকিৎসা নিতে শুরু করেন। কেউ বাড়ির বাইরে রাস্তায় দাড়িয়েই সর্প দংশনের শিকার হয়েছে বলে ছুটতে শুরু করেন ওঁঝার বাড়িতে। এভাবে যত আতঙ্ক ছড়াতে থাকে, ততই আক্রান্ত হতে থাকে শিশু-কিশোর, নারী-পুরুষ।তবে স্বাস্থ্য বিভাগ বলছে, এটা গণমনস্তাত্ত্বিক সমস্যা ছাড়া কিছুই নয়।

খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে গেলে এলাকাবাসী জানায়, সাপ দেখা যাচ্ছে না। অদৃশ্য সাপে কেটেছে বলে সন্দেহ হতেই গায়ে জ্বালাপোড়া শুরু হচ্ছে। ওঝার কাছে গেলে হাতচালান দিয়ে, কারো ক্ষেত্রে বলছে বিষ বুক পর্যন্ত উঠেছে, আবার কারো বলছে গলা পর্যন্ত বিষ উঠে গেছে। এতে আক্রান্ত ব্যক্তির আতঙ্কের মাত্রা আরো বেড়ে যাওয়ায় ঘাড় পর্যন্ত বাকা হয়ে যাচ্ছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে না পেরে গ্রামের কেউ কেউ গত বৃহস্পবার খবর দেন বেলগাছি শেখ পাড়ার গ্রামের নারী ওঝা সুফিয়া খাতুনকে। তিনি বৃহস্পতিবার খবরে পেয়ে রাতে বলেম্বরপুর গ্রামের ওঝা মনোয়ার মন্ডলের বাড়ি বসে শুরু করেন ধ্যানের নামে নাটক। এই মনোয়ার মণ্ডলই বাপ-ব্যাটা দু’জন মিলে কয়েকদিন ধরে ঝাড়ফুঁক নামে নাটক চালিয়ে যাচ্ছেন। ধ্যানের ভান করে দীর্ঘ সময় বসে থাকার পরে তিনি বলেন, জিনসাপের উপদ্রব হয়েছে। এ জিনসাপ তাড়াতে হলে গ্রামে খাসি মেরে ছিন্নি করতে হবে। গত শুক্রবার চাল-ডাল তুলে খিচুড়ি রান্না করে ছিন্নি করা হয়েছে।

বলেশ্বরপুর উত্তর পাড়ার মনোয়ার মন্ডল ঠিক কবে, কখন থেকে ওঝাগিরি শুরু করেছেন তা স্পষ্ট করে তেমন কেউ বলতে পারেনি। গত বুধবার তিনি রিপা নামের ১০ বছর বয়সী এক শিশুকে সাপে কেটেছে বলে ঝাড়ফুঁক শুরু করেন। নিজের বাড়িতে এ ঝাড়ফুঁকের নাটক করা হয়। এই দৃশ্য দেখে ও সাপে কাটার গল্প শুনে আতঙ্কগ্রস্থ হয়ে ৯ বছরের শিশু বায়েজিদও সাপে কেটেছে বলে কান্নাকাটি শুরু করে দেয়। তাকে নেয়া হয় ওই ওঝার কাছে। শুর হয় ঝাড়ফুঁক। একই দিন মুক্তা (২৩) ও রকিবুল ইসলাম (১৭) সহ রবিবার (৬ মে) পর্যন্ত গ্রামটির ৩৩ জন কথিত জিনসাপের দংশনে অসুস্থ হয়েছে।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, যে ৩৩ জন কথিত জিনসাপে দংশন করেছে বলে দাবি করা হচ্ছে, তারা সবাই একই মহল্লার বাসিন্দা এবং পরস্পরের আত্মীয়। তাদের শরীরে কোথাও কাটা-ছেঁড়ার দাগ পাওয়া যায়নি। অথচ তারা প্রচার করছেন, কারো পায়ে, কারো হাতে, কারো শরীরে দংশন করেছে জিনসাপ। সবাই অভিন্ন ভাষায় শরীর দুর্বল, মাথা ঝিমঝিম করা ও শরীর জ্বলে যাওয়ার কথা বলছেন।

যারা জিনসাপের অস্তিত্ব নেই বলে মত দিয়েছেন, তারা বলছেন, এক শ্রেণির মানুষ বৃথা আতঙ্ক ছড়াচ্ছে। তাদের লক্ষ্য, টাকা-পয়সা হাতিয়ে নেওয়া।এমন ভাষ্যের সত্যতা মিলল ওঝা মনোয়ারের বাড়িতে অবস্থানকালেই। সেখানে আসেন ঝিনাইদহের সাপুড়ে লিটন মল্লিক। তিনি দাবি করেন, গ্রামটিতে জিনসাপকে সন্তুষ্ট করতে ঝাঁপান (ডুলিবিশেষ, মনসাপূজার অনুষ্ঠানাদির অঙ্গবিশেষ) গানের আয়োজন করতে হবে। এতে প্রায় ১২ হাজার টাকা খরচ হবে।

হাড়োকান্দি-বলেশ্বপুর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ১০ শ্রেণির ছাত্র হৃদয় আলী বলেন, তার ছোট বোন রিপা খাতুন অসুস্থ হয়ে পড়ে। তাকে চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতালে নেওয়া হয়। চিকিৎসক জানিয়েছেন, সে গণমনস্তাত্ত্বিক রোগে ভুগছে। হৃদয় আরো বলেন, আমিও জিনসাপে বিশ্বাস করি না।ওই মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ধর্মীয় শিক্ষক ছানোয়ার হোসেন বলেন, ইসলাম ধর্মে কোথাও জিনসাপের অস্তিত্ব নেই। এটা এক ধরনের কুসংস্কার।

আলমডাঙ্গা উপজেলার স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা মাসুদ রানা বলেন, যারা জিনসাপে কামড়িয়েছে বলে দাবি করছে, তারা আসলে গণমনস্তাত্ত্বিক রোগে ভুগছে। এটা আসলে একজনের দেখাদেখি অন্যজন অসুস্থ হয়ে পড়ার ঘটনা।

চুয়াডাঙ্গার সিভিল সার্জন ডা: খাইরুল আলম বলেন, ‘বলেশ্বরপুর গ্রামে সাপের উৎপাতের খবর আমি শুনেছি’। সাপে দংশন করা রোগীর চিকিৎসার জন্য ইনজেকশন আছে হাসপাতালে। গ্রামে কেউ অসুস্থ হয়ে পড়লে তাকে দ্রুত হাসপাতালে এসে চিকিৎসা নিতে হবে। গ্রামটিতে মেডিকেল টিম পাঠানো হবে।

আরও পড়ুন

%d bloggers like this: