শনিবার, ২১ জানুয়ারী ২০২৩, ০৯:৫৭ অপরাহ্ন

(মাসুদ আলম, কুমিল্লা)
কুমিল্লায় বন্দুকযুদ্ধে নিহত মাদক ব্যবসায়ীসারাদেশে পুলিশের মাদকবিরোধী অভিযানের ধারাবাহিকতায় কুমিল্লায় বন্দুকযুদ্ধে ৬ জন নিহত হয়েছেন। জেলা গোয়েন্দা শাখা (ডিবি) ও পুলিশের দাবি, যারা নিহত হয়েছে তারা সবাই জেলার শীর্ষ মাদক ব্যবসায়ী ছিলেন। তবে নিহতদের স্বজনরা দাবি করেছেন, নিহতরা আগে মাদকের খুচরা ব্যবসার সঙ্গে জড়িত থাকলেও সাম্প্রতিক সময়ে তারা মাদক ব্যবসা ছেড়ে দিয়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে এসেছিলেন। এলাকাবাসী তাদের খুচরা মাদক ব্যবসায়ী হিসেবে উল্লেখ করেছেন।

পুলিশ সূত্রে জানা যায়, গত ২১ মে গভীর রাতে কুমিল্লার সদরের সীমান্তবর্তী এলাকা বিবির বাজারের পাশে অরণ্যপুরে পুলিশের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে শীর্ষ মাদক ব্যবসায়ী শরীফ (২৬) ও পিয়ার আলী (২৮) নিহত হয়। এ ঘটনায় আহত হয় আরও একজন। এছাড়া মঙ্গলবার রাত পৌনে ১টার দিকে কুমিল্লা সদরের টিক্কারচর ব্রিজ এলাকায় বন্দুকযুদ্ধে আরেক মাদক ব্যবসায়ী নুরুল ইসলাম ইছা নিহত হয়। বুধবার রাতে কুমিল্লার চৌদ্দগ্রাম উপজেলায় পুলিশের সঙ্গে ‘বন্ধুকযুদ্ধে’ বাবুল মিয়া ওরফে লম্বা বাবুল (৩৮) ও সদর দক্ষিণে রাজিব (২৬) নামে দুই ‘মাদক ব্যবসায়ী’ নিহত হয়েছেন। বুধবার (২৪ মে) রাত ১টার দিকে চৌদ্দগ্রামের উপজেলার আমানগন্ডা এলাকায় ও রাত সোয়া ২টা দিকে দক্ষিণ সদরের গোয়ালমথন এলাকায় এ দুটি ‘বন্দুকযুদ্ধে’র ঘটনা ঘটে। বৃহস্পতিবার রাত বুড়িচংয়ে ফেন্সি কামাল নামে একজন নিহত হয়।

নিহত মো. শরীফ জেলার সদর দক্ষিণ উপজেলার মহেষপুর গ্রামের আবদুল মান্নানের ছেলে। তার বিরুদ্ধে ৫টি মাদক মামলা রয়েছে। অপর নিহত পিয়ার আলী আদর্শ সদর উপজেলার শুভপুর গ্রামের আলী মিয়ার ছেলে। তার বিরুদ্ধে ১টি হত্যাসহ ১২টি মাদকের মামলা রয়েছে। নিহত ইছা (৩৫) একই উপজেলার গাজীপুর গ্রামের আবদুল জলিলের পুত্র। তার বিরুদ্ধে ৫টি মাদক মামলা রয়েছে। বুধবার নিহত বাবুল মিয়া ওরফে লম্বা বাবুল উপজেলার পৌর এলাকার মৃত হাফেজ আহমেদের ছেলে এবং নিহত রাজিব সদর দক্ষিণ উপজেলার কোটবাড়ি সংলগ্ন চাঙ্গিনী গ্রামের মৃত শাহ আলমের ছেলে। পুলিশের দাবি, উভয়ই তালিকাভুক্ত মাদক ব্যবসায়ী। উভয় ঘটনাস্থল থেকে অস্ত্র ও মাদক উদ্ধার করা হয়েছে বলেও পুলিশ জানিয়েছে।

বন্দুকযুদ্ধে নিহত পিয়ার আলীর বড় বোন তাছলিমা বেগম বলেন, ‘গত ২১ মে বিকালে পুলিশ পিয়ার আলীকে বাড়ি থেকে হাতকড়া লাগিয়ে গ্রেফতার করে নিয়ে যায়। তখন সে শার্ট এবং লুঙ্গি পরা অবস্থায় ছিল। ওই দিন রাত দেড়টার দিকে আমাদের জানানো হয় পিয়ার পুলিশের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে মারা গেছেন। হাতকড়া পড়া অবস্থায় কীভাবে একজন মানুষ পুলিশের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধ করবে তা আমরা জানি না।’

তিনি জানান, পিয়ার ২-৩ বছর আগে মাদকদ্রব্য কেনাবেচার সঙ্গে জড়িত ছিল। তখন তার বিরুদ্ধে থানায় ১২-১৩টি মামলা হওয়ায় সে মাদক ব্যবসা ছেড়ে দেয়। গত দুই বছর ধরে সে মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িত ছিল না।

বন্দুকযুদ্ধে নিহত আরেক মাদক ব্যবসায়ী নুরুল ইসলাম ইছা তার পরিবার নিয়ে কুমিল্লার সীমান্তবর্তী বিবির বাজারের পাশের এলাকায় কেটিটিসির দেওয়া সরকারি জায়গায় থাকতেন। দুই ছেলে, এক মেয়ে এবং স্ত্রী নিয়ে থাকতেন তিনি। তার স্ত্রী সেলিনা আক্তার বলেন, ‘গত ২১ মে রাত ১টার দিকে পুলিশ ইছাকে ঘুম থেকে তুলে নিয়ে যায়। পরে ২২ মে রাত ১টার দিকে আমাদের জানানো হয় ইছা পুলিশের সাথে বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয়েছে।’

তিনি স্বীকার করে বলেন, ‘আমার স্বামী দেড় বছর পূর্বে মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িত ছিলেন। গত এক বছর ধরে তিনি সিএনজি চালিয়ে আমাদের সংসার চালিয়েছেন।’

জেলা গোয়েন্দা পুলিশ সূত্রে জানা যায়, কুমিল্লার ১৭ উপজেলার সকল মাদক ব্যবসায়ীদের নিয়ে শীর্ষ দশজনের একটি তালিকা করা হয়েছে। সেই শীর্ষ দশজনের মধ্যে কুমিল্লা সদরে নিহত তিনজন রয়েছে। তবে ওই তালিকায় থাকা মাদক ব্যবসায়ীরা কুমিল্লা আদর্শ সদর উপজেলা, চৌদ্দগ্রাম, বুড়িচং এবং ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলারই বেশি।

পুলিশের দেওয়া তথ্যমতে জানা যায়, কুমিল্লার মাদক ব্যবসায়ী গডফাদারদের মধ্যে এক নম্বর মাদক ব্যবসায়ী হলেন গঙ্গানগর মহল্লার মৃত তৈয়ব আলীর ছেলে আবুল হোসেন। তিনি মূলত গাঁজা ব্যবসায়ী। তার নামে ৪টি মাদক মামলা আছে। সালদানদী রেলস্টেশনের পাশে তার বাড়ি। রেল নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে তিনি দেশের বিভিন্ন স্থানে মাদক পৌঁছে দেন। তিনি থাকেন কুমিল্লার ভারতীয় সীমান্তে নো-ম্যানস ল্যান্ডের কাছাকাছি। গ্রেফতার করতে গেলেই তিনি ভারতে চলে যান।

তালিকার দু’নম্বরে আছে হূমায়ন মেম্বারের নাম। তার বাবা মৃত শরাফত আলী। বুড়িচং থানার চড়ানল এলাকায় তার বাড়ি। তার বিরুদ্ধে ৫টি মামলা রয়েছে। নিজস্ব বেতনভুক্ত কর্মচারীদের মাধ্যমে তিনি বিভিন্ন জায়গায় হোম সার্ভিসে মাদক ব্যবসা করেন। এছাড়া, আবদুল জলিল নাঙ্গলকোট বটতলী ইউনিয়নের কাশিপুর গ্রামের বাসিন্দা এবং সাবেক মেম্বার। তিনি কুমিল্লার দক্ষিণ অঞ্চলগুলোতে মাদক সরবরাহ করে থাকেন।

মাদকবিরোধী অভিযানে প্রকৃত মাদক ব্যবসায়ীরা ধরা পড়ছেন কিনা জানতে চাইলে কুমিল্লা জেলা অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আবদুল্লাহ আল-মামুন বলেন, ‘পুলিশের আইজির দেওয়া নির্দেশ অনুসারে এক রমজান থেকে দশ রমজান পর্যন্ত পুলিশের মাদকবিরোধী সাঁড়াশি অভিযান চলবে। এই অভিযানের ভিত্তিতে গত তিন দিনে পুলিশের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে পাঁচ মাদক ব্যবসায়ী নিহত হয়েছে।’

যেসব মাদক ব্যবসায়ী বেঁচে আছে তাদের সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘যারা বেঁচে আছে তারাও পুলিশের তালিকায় রয়েছে। তবে কিছু কিছু গডফাদার আত্মগোপনে রয়েছে। তাদেরও আইনের আওতায় আনার চেষ্টা চলছে।’

মাদক ব্যবসার সঙ্গে আর কারা জড়িত জানতে চাইলে আবদুল্লাহ আল-মামুন বলেন, ‘মাদক ব্যবসার সঙ্গে বিভিন্ন শ্রেণিপেশার মানুষ জড়িত রয়েছে। তার মধ্যে পুলিশ, সাংবাদিক, রাজনীতিবিদরাও জড়িত থাকতে পারে। ওইসব ব্যক্তি মাদক ব্যবসার সঙ্গে সরাসরি জড়িত না থাকলেও তারা মাদক ব্যবসায়ীদের বিভিন্ন কায়দায় সহযোগিতা করে থাকেন।’

কুমিল্লা পুলিশের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে নিহত শরীফ ও পিয়ারের গডফাদার বা নেতা কে জানাতে চাইলে তিনি বলেন, ‘শরীফ, পিয়ার ও ইছাসহ অন্য মাদক ব্যবসায়ীদের কারা নেতৃত্ব দিচ্ছে তা পুলিশ তদন্ত করছে। ক্রমান্বয়ে তাদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

নিহতের স্বজনরা দাবি করেছে যে পূর্বে মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িত থাকলেও বর্তমানে তারা জড়িত ছিলেন না। এ ব্যাপারে জানতে চাইলে কুমিল্লা জেলা অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আবদুল্লাহ আল-মামুন বলেন, ‘নিহতদের বিরুদ্ধে থানায় অসংখ্য মামলা রয়েছে। পুলিশের খাতায় তারা শীর্ষ মাদক ব্যবসায়ী হিসেবে পরিচিত। তারা পূর্বে মাদক ব্যবসায়ী ছিলেন, পরে মাদক ব্যবসার গডফাদার হয়েছিলেন।’

আরও পড়ুন

%d bloggers like this: