বৃহস্পতিবার, ০৩ ডিসেম্বর ২০২০, ১২:৫৫ পূর্বাহ্ন


কর্মব্যস্ত দিন শেষে এক মগ কফি হাতে সবুজের মাঝে কাটানো সময় আপনার মন ও শরীরের ক্লান্তি দূর করে আপনাকে সতেজতায় ভরিয়ে দিতে পারে। কিংবা প্রভাতে সবুজের সতেজ স্পর্শ সারা দিন আপনাকে উদ্যমী রাখতে পারে। কারণ সবুজের মাঝেই আছে প্রাণের স্পন্দন, মনের প্রশান্তি। বিষাক্ত বাতাসে ভারী বায়ুমন্ডলে অক্সিজেনের উৎস সৃষ্টিতেও প্রয়োজন সবুজের সমারোহ।
কিন্তু ভাবছেন ইট কাঠ পাথরের শহরে সবুজ পাবেন কোথায়?

সমাধান সহজ। আপনার বাসার বারান্দার এক চিলতে জায়গাতেই গড়ে তুলুন আপনার একান্ত নিজস্ব নাগরিক অরণ্য। সঠিক গাছ, টব ও সাজানোর পদ্ধতি নির্বাচনের মাধ্যমে আপনার বারান্দা হতে পারে সবুজের স্বর্গ। স্বর্গ কিন্তু সত্যিই সবুজ। পবিত্র ধর্মগ্রন্থেও স্বর্গের বর্ণনায় নয়নাভিরাম উদ্ভিদ ও সবুজায়িত পরিবেশের কথা বলা হয়েছে বার বার।

গাছ আমাদের এমন এক বন্ধু যে শুধু দিতে জানে। আপনার অল্প ভালোবাসা ও যত্নের বিনিময়ে আপনাকে বহুগুণ ভালোবাসা, প্রশান্তি ও সতেজতা ফিরিয়ে দেবে। আর আমার মত সরকারি কর্মজীবি মানুষ যারা চাকরির প্রয়োজনে পরিবার থেকে দূরে থাকেন তাদের জন্য বারান্দা বাগান যেন আপন জনের পরশ। আমাকে অনেকেই বারান্দা বাগানের বিষয়ে অনেক খুঁটিনাটি বিষয় জিজ্ঞেস করেন। প্রথম প্রশ্ন থাকে কি ধরণের গাছ বারান্দায় লাগালে ভালো হয়? নার্সারীতে গিয়ে নার্সারীর লোকজনের কথায় গাছ কিনে এনে লাগানোর পর দেখি কদিনেই মরে যাচ্ছে; কোন গাছের যত্ন কিভাবে নিতে হয় ইত্যাদি। আমি এখানে সংক্ষেপে বারান্দা বাগানের জন্য গাছ নির্বাচনের বিষয়ে আমার অভিজ্ঞতা শেয়ার করছি।

প্রথমে বলে নেই আমি বাগান বিষয়ে বিশেষজ্ঞ কেউ নই। বিগত দুই/তিন বছর ধরে বারান্দায় বাগান করার অভিজ্ঞতা থেকে এই লেখা। বারান্দায় বাগান করার উত্তেজনায় অনেক গাছ, টব কিনে টাকা খরচ না করে একটু প্ল্যাানিং করে আগানো ভালো। প্ল্যানিং এর ক্ষেত্রে সঠিক গাছ নির্বাচন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। গাছ নির্বাচন করার ক্ষেত্রে কিছু প্রভাবক মাথায় রাখতে হবে। প্রভাবক গুলো আমি একের পক এক আলোচনা করছি।
বারান্দায় কেমন রোদ আসে?

বারান্দায় কেমন গাছ লাগাবেন তা প্রথমেই নির্ভর করবে বারান্দায় কেমন রোদ আসে তার উপর। রসালো কান্ডের তৃণজাতীয় গাছ যেমন মর্নিং গ্লোরী, দায়ান্থাস, আইসপ্লান্ট, অপরাজিতা, পর্তুলিকা, তুলসী, ল্যাভেন্ডার, কয়েন প্যান্ট; মরুর গাছ যেমন ক্যাকটাস, স্যাকুলেন্ট, স্টেপলিয়া; এডেনিয়াম (মরূ গোলাপ), কাটামুকুট; দেশীয় ফুলের গাছ যেমন জুঁই, অর্কিড, বেলি, গোলাপ, টগর, দোলনচাঁপা, জবা ইত্যাদি গাছের পর্যাপ্ত রোদের দরকার হয়। তাই বারান্দায় যে অংশে রোদ আসে সেই অংশে এইসব গাছ লাগানো যেতে পারে।

তবে শহরের বেশিরভাগ বারান্দায় সরাসরি রোদ আসেনা বা আসলেও খুব অল্প সময় থাকে। সে ক্ষেত্রে বিভিন্ন ধরণের পাতাবাহার, মানিপ্লান্ট; বাল্ব এর মাধ্যমে হয় এমন গাছ যেমন বিভিন্ন ধরণের লিলি (এমারিলিস লিলি, রেইন লিলি, পিস লিলি ইত্যাদি; রানাঙ্কুলাস, লিলিয়াম); হায়াসিন্থ; রাবার প্ল্যান্ট; লাকিব্যম্বু; ইঞ্চিপ্ল্যান্ট; এরিকা পাম; স্নেক প্ল্যান্ট; ক্যালাডিয়াম; পার্পেল হার্ট; স্পাইডার প্ল্যান্ট ইত্যাদি গাছ লাগানো যেতে পারে। সব এইসব গাছ সপ্তাহে একবার অন্তত ভালো রোদ পায় এমন জায়গায় রাখলে ভালো থাকবে।

কি ধরণের বারান্দা?
বারান্দার সাইজের উপর এবং কেমন ডেকোরেশন পছন্দ তার উপরও গাছ নির্বাচন নির্ভর করে। আমি যেমন পুরো বারান্দা গাছে ভরে ফেলতে আগ্রহী নই। গাছের জন্য বারান্দায় বসে চা খাওয়ার, দাঁড়িয়ে আকাশ দেখার, কাপড় শুকাতে দেয়ার স্পেস না পাওয়া গেলে বাগানে করার উদ্দেশ্য ব্যহত হয় আবার কাজেও অসুবিধা হয়। তাই ছোট বারান্দায় বেশি ঝোপালো গাছ আমার পছন্দ নয় তবে যদি এমন হয় যে ঝোপটা বারান্দার বাইরে দিয়ে দেয়া যায় যেমন বাগান বিলাস সে ক্ষেত্রে ঝোপালো গাছ লাগানো যেতে পারে। এছাড়া বড় গাছের ক্ষেত্রে কাঠগোলাপের ছোট ভার্সন লাগানোর সুযোগ আছে। আজকাল নার্সারিগুলো থেকে কিনে বা নিজে কলম করে অনেকে কাঠগোলাপ লাগাচ্ছেন। মানিপ্ল্যান্ট , ইঞ্চিপ্ল্যান্ট, বেবি টিয়ার্স, পিটূনিয়া,বিভিন্ন অর্কিড, ফার্ন, পর্তুলিকা ইত্যাদি গাছ বারান্দার ছাদ থেকে বা গ্রিলের যাথে ঝুলিয়ে দিতে পারেন। এখন গ্রিলের সাথে ঝুলানোর জন্য উপযোগী বিভিন্ন টব পাওয়া যায় যাতে ছোট অনেক গাছ লাগানো যায়। আবার বারান্দায় তাক বানিয়ে বা স্ট্যান্ড এর মত তৈরি করে বা কিনেও গাছ রাখা যায়। বারান্দার পাশের দেয়ালেও ড্রিল করে প্লাাস্টিকের টব লাগানো যায়। আজকাল দেয়ালে ও বারান্দার গ্রিলের সাথে লাগানোর বিভিন্ন ধরণের স্ট্যান্ডও পাওয়া যায়।

গাছের পেছনে ব্যয় করার মত কতটুকু সময় হাতে থাকে?
বারান্দার গাছের নিয়মিত যত্নের প্রয়োজন হয়। যেমন গাছ বুঝে নিয়মিত পানি দেয়া, সপ্তাহে একবার মাটি নিংড়ে দেয়া, আগাছা পরিস্কার করা, নিয়মিত বিরতিতে সার দেয়া, পোকা মাকড় বা রোগ বালাই হয়েছে কিনা খেয়াল রাখা,নির্দিষ্ট সময় পর মাটি পরিবর্তন করা বা রিপটিং ইত্যাদি। আবার কিছু কিছু বিশেষ গাছকে বিশেষ ধরনের যত্ন করতে হয়। আমার মত যারা চাকরিজীবি তাদের গাছের যত্ন নেয়ার সময় কম থাকে। তাই গাছ নির্বাচনের সময় কম যত্ন লাগে এমন গাছ বাছাই করতে হিবে। নিয়মিত পানি দেয়া, সপ্তাহে একবার মাটি নিংড়ে দেয়া, বছরে একবার রিপটিং করা ছাড়া ক্যকটাস, স্টেপলিয়া, মানিপ্ল্যান্ট; লিলি; স্ন্যাক প্ল্যান্ট; স্পাইডার প্ল্যান্ট; বিভিন্ন পাতাবাহার ইত্যাদির তেমন আলাদা কোন যত্ন লাগে না। তাই এই গাছ গুলো কর্মজীবি বা ঘরের কাজে ব্যস্ত নারী বা পুরুষের জন্য বাগান করার ক্ষেত্রে প্রথম পছন্দ হতে পারে।

সবজি বাগান
বারান্দায় পুদিনা পাতা, ধনে পাতা, কারি পাতা, থাই পাতা, পোলাও পাতা, মরিচ, পালং শাক, পুঁইশাকইত্যাদি সহজেই ফলানো সম্ভব। যাদের বড় বারান্দা এবং রোদ আসে তারা চাইলে টেমটো, বেগুন, লেবু থেকে শুরু করে লাউ, ঢেঁড়স, করলা, আম গাছও সীমিত পরিসরে বারান্দায় লাগাতে পারেন।

জলজ বাগান
নানা ধরণের জলজ গাছ আপনার বাগানে নতুন মাত্রা যোগ করতে পারে। বর্তমানে নার্সারি ও অনলাইন গাছ কেনা বেচার পেইজ গুলোতে অনেক ধরণ ও কালারের শাপলা, পদ্ম গাছ বা বীজ পাওয়া যায়। এছাড়া সোর্ড লিলি, ওয়াটার লেটুস, স্বর্ণমুকুট, জলগোলাপ ইত্যাদিও জলজ গাছ। মশার বংশবিস্তার নিয়ন্ত্রণে জলজ গাছের গামলা বা পাত্রে গাপ্পি মাছ ছেড়ে দিলেই হবে।

ইনডোর প্ল্যান্ট –
ঘরের ভেতরে একঝলক সবুজের ছোঁয়া এনে দিতে পারে, ঘরের সজ্জায় ভিন্ন মাত্রা যোগ করতে পারে ইনডোর প্ল্যান্ট ।ঘরে লাগানো এই ঘরোয়া গাছ গুলো ঘরে তৈরি হওয়া কার্বন ডাই অক্সাইড ও অন্যান্য দূষিত ক্ষতিকারক উপাদান শোষণ করে শ্বাস নেয়ার অক্সিজেনকে আরও বিশুদ্ধ করতে পারে, ঘরের পরিবেশ শীতল করতে পারে সর্বোপরি ঘরে সতেজ আবহ তৈরি করতে পারে। বিভিন্ন ধরণের পোথোস (মানি প্ল্যান্ট, সিলভার সাতিন, নিয়ন পোথোস, ইত্যাদি) জেডজেড প্ল্যান্ট, জামিয়া,এগ্লোইনিমা, স্ন্যাক প্ল্যান্ট, স্পাইডার প্ল্যান্ট, ড্রেসিনা, লাকি ব্যাম্বু, পিস লিলি, এরিকা পাম, রাবার প্ল্যান্ট, বোস্টন ফার্ণ, তুলসি ইত্যাদি ইনডোর প্ল্যান্ট গুলো সহজেই পাওয়া যায় এবং খুব অল্প পরিচর্যায় বেড়ে উঠে।

বারান্দার সাজ সজ্জা-
বারান্দার সাজসজ্জা যার যার রুচির প্রতিফলন। কিছু আইডিয়া শেয়ার করছি। নগরায়নের যুগে শহরের পাখিরা গৃহহীন, অন্নহীন হয়ে পড়ছে। আপনার বারান্দায় কাঠের তৈরি পাখির বাসা বা বার্ড ফিডার অথবা প্লাস্টিক বোতল বা কার্টন দিয়ে নিজ হাতে তৈরি পাখির বাসা বা বার্ড ফিডার আপনার বারান্দার সৌন্দর্য্য বহুগুণে বৃদ্ধি করবে আবার প্রকৃতিও এতে উপকৃত হবে। পর্যাপ্ত জায়গা থাকলে বসে সময় কাটানোর জন্য দোলনা কিংবা ইজি চেয়ার রাখা যেতে পারে। ফেইরি লাইট/ ঝুলন্ত বাতি রাতের বারান্দার রুপ পাল্টে রোমান্টিক আবহ দিতে পারে। কিংবা বারান্দায় ঝুলানো উইন্ড চাইমের টুংটাং শব্দ আপনাকে ক্ষণিকের জন্য হলেও স্বপ্নিল জগতে নিয়ে যেতে পারে।
বাগানের সবুজতা ও সৌন্দর্যতায় আবেশায়িত হোক মন। বারান্দা বাগানীদের সুন্দর মনের সাথে সবুজের সেতুবন্ধন হোক।

লেখকঃ ফারহানা লোকমান
সিনিয়র সহকারী জজ

আরও পড়ুন

বাংলাদেশে কোরোনা

সর্বশেষ (গত ২৪ ঘন্টার রিপোর্ট)
আক্রান্ত
মৃত্যু
সুস্থ
পরীক্ষা
২,৯৪৯
৩৭
২,৮৬২
১৩,৪৮৮
সর্বমোট
১৭৮,৪৪৩
২,২৭৫
৮৬,৪০৬
৯০৪,৫৮৪
%d bloggers like this: